বিজয় গুপ্ত

যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।

বিজয় গুপ্ত নিজের আত্মপরিচয় দিয়েছেন ‘পদ্মাপুরাণ’ তথা ‘মনসা মঙ্গলের’ পদে | ফতেয়া--
বাদ মুলুকের বাঙ্গজোড়া তকসিমের অন্তর্গত ঘাগর নদীর পূর্ব, গন্ডেশ্বর নদীর পশ্চিমে ফুল্লশ্রী গ্রামে তাঁর
নিবাস ছিল | গ্রামটি ছিল বেশ শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত | ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য জাতির আবাস এই গ্রামে শাস্ত্র
চর্চার প্রাবল্য ছিল | বিজয় গুপ্ত নিজে বৈদ্য ছিলেন | তাঁর পিতা সনাতন, মাতা ছিলেন রুক্মিনী | বিজয়ের
পিতা সনাতন গুপ্ত | বিজয়ের ভাষ্য :--

. সনাতন তনয় রুক্মিনী গর্ভজাত |
. সেই বিজয় গুপ্তরে রাখ জগন্নাথ ||

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস মহাশয়ের ধারণা সনাতন ছিলেন ঘর-জামাই |
তাঁর শ্বশুর হেরম্ব দাশগুপ্ত | ফরিদপুর জেলার বুরলিয়া গ্রাম থেকে কোনো কারণে তিনি চলে আসেন ফুল্লশ্রী
গ্রামে | তাঁর সঙ্গে ছিলেন পারিবারিক পুরোহিত রামটুরী চক্রবর্তী আর ভৃত্য কাশীরাম চন্দ | হেরম্ব
দাশগুপ্তের দুই পুত্র ত্রিলোচন দাশ আর রাঘবেন্দ্র দাশ | এক কন্যা রুক্মিনী | গৈলা-ফুল্লশ্রী ‘বড় দাশ’ বাড়ি
নামে বিজয় গুপ্তের মাতুল বংশের আবাসের খ্যাতি ছিল | বিজয়ের মাতুল ত্রিলোচন দাশের পান্ডিত্য-খ্যাতি
ছিল | তিনি ছিলেন কলাপ ব্যাকরণের টীকাকার ; তিনি ‘কবিরত্ন’ উপাধি লাভ করেছিলেন |

বিজয় সম্ভবত মাতুল বংশের সূত্রে মনসা মঙ্গল রচনার প্রেরণা ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন |
তাঁর রচনায় যশোহর-খুলনা-ফরিদপুর অঞ্চলের ভাষার সামান্য পরিচয় মেলে |

বিজয়ের কাব্য রচনার কালজ্ঞাপনীটি সুপরিচিত |
. ঋতু শূন্য বেদ শশী পরিমিত শক |
. সুলতান হোসেন শাহ নৃপতি তিলক |

কালজ্ঞাপনীটির ভেদ আঙ্কিক নিয়মে হয় ১৪০৬ শকাব্দ অর্থাৎ ১৪৮৪ খ্রীঃ | ডঃ সুকুমার সেন এই তারিখ
অগ্রাহ্য করেছেন কারণ তখন হোসেন শাহ সিংহাসনে আসীন ছিলেন না | (সুকুমার সেন : বাঙ্গালা সাহিত্যের
ইতিহাস, প্রথম খন্ড পূর্বার্ধ, চতুর্থ সংস্করণ) | “আমরা দেখিয়াছি এই হোসেন কিন্তু আলাউদ্দিন হোশেন নন
--- তিনি জালালউদ্দিন ফতে শাহ | জালালউদ্দিন, হোসেন নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন” |

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কিছু সংবাদ বিজয়ের কাব্যে পাওয়া যায় | সময় সচেতন রসিক কবি বিজয়
গুপ্ত | হোসেন শাহের প্রশংসা করেছেন |

. সংগ্রামে অর্জুন রাজা প্রভাতের রবি |
. নিজ বাহু বলে রাজা শাসিল পৃথিবী ||
. রাজার পালনে প্রজা সুখ ভুঞ্জে নিত |
. মুল্লুক ফতেয়াবাদ বাঙ্গ জোড়া তকসিম ||

কানাহরি দত্তের ‘অনুবন্ধে’ বিজয় গুপ্ত লিখেছেন হতে পারে | তবে তাঁর কানাহরি দত্তের প্রতি খুব ভালো
ধারণা ছিল না | ‘স্বপ্নাধ্যায়’ অংশে দেবী মনসার জবানীতে লিখেছেন বিজয়
. মূর্খে রচিল গীত না জানে মাহাত্ম্য |
. প্রথমে রচিল গীত কানাহরি দত্ত ||
….পংক্তি দুটি বাংলা সাহিত্যের গবেষক শিক্ষক মহলে সুপরিচিত | তবে এর পাঠান্তর অধিকতর অর্থ
বহন করে | যেমন ---
. সর্ব লোকে গীত গাহে না বোজে মাহাত্ম্য |
. প্রথমে রচিল গীত কানাহরি দত্ত ||
(...যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্যের সংকলন ‘বাংলা পুথির তালিকা সমন্বয়’, দ্বিতীয় খন্ড ; এশিয়াটিক সোসাইটি ;
কলকাতা ১৯৯৮ , ১০৩ পৃষ্ঠা)

বাংলাদেশের সামান্য কিছু পুথির তালিকা ডঃ ভট্টাচার্য দেখেননি | সেখান থেকেও বিষয়টি পরিস্কার | পূর্ণাঙ্গ
পুথি নেই | খন্ড পুথিও নেই ! এ অবস্থায় পুথি নির্ভর সংস্করণ করা যায়নি | বাণী নিকেতন প্রকাশিত
‘পদ্মাপুরাণ’ প্যারীমোহন দাশগুপ্তের পুথির উপর নির্ভরশীল | প্যারী মোহন ছিলেন বিজয় গুপ্তের মাতুল
বংশের মানুষ | তিনি একাধিক পুথি সংগ্রহ করে ১৮৯৫ এর আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে একটি
পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন | ( ১৫.৮.১৮৯৫ ~ ১৬.১১.১৮৯৫ ) | বরিশালের আদর্শ প্রেস-সংস্করণ তৈরি হয় এই
পান্ডুলিপি অবলম্বনে | সম্পাদক ছিলেন দুজন --- শ্রী সুকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং সুরেশচন্দ্র ঘোষ | বাণী
নিকেতন সংস্করণের মূল এই আদর্শ প্রেস থেকেই গৃহীত | প্রকাশক শ্রী বসন্ত কুমার ভট্টাচার্য | ১৩৫৫-এর
রথযাত্রার দিন প্রকাশিত এই সংস্করণ | বসন্ত কুমার বরিশালে থাকতেন | তাঁর সময়ে বিজয় গুপ্ত
কিংবদন্তী জনশ্রুতির চরিত্র হয়ে গেছেন | গৈলা ফুল্লশ্রী গ্রাম হয়েছে ‘মানসী’ | বিজয় গুপ্তের মনসাবাড়িতে
ধাতব মূর্তি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে | সামনে অতি প্রাচীন সরোবর |

পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কবি | প্রাপ্ত পুথির বয়স বিচার করে তাঁর কাব্যকে কেউ কেউ আধুনিক
কালের রচনা বলে মনে করেন | বিজয় গুপ্তর কাব্যের নাম "পদ্মাপুরাণ" | তাঁর রচনা রীতি নিরাড়ম্বর, সহজ
এবং উপভোগ্য | কাব্যটি পূর্ববঙ্গে বহু জায়গায় বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে |



এই সাইড সম্পর্কে কোন তথ্য জানতে অথবা আপনার মতামত দিতে email করুন
kobita10@yahoo.com
ধন্যবাদ