বারীন্দ্রকুমার ঘোষ

যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।

 বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বা সংক্ষেপে বারীন ঘোষ  (০৫. ০১. ১৮৮০ ~ ১৮. ০৪. ১৯৫৯) ইংল্যাণ্ডের রাজধানী লণ্ডনের নরউড এর কাছে অবস্থিত ক্রয়ডন এ জন্ম গ্রহণ করেন | পিতা ডঃ কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন প্রথিতযশা চিকিত্সক এবং 
ডিস্ট্রিক্ট সার্জেন | মাতা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের রাজনারায়ণ বসুর কন্যা | তাঁর মেজদা মনমোহন
ঘোষ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক এবং কবি |
সেজদা ছিলেন বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ যিনি পরে ঋষি অরবিন্দ নামে খ্যাত হন |

১৮৯৮ সালে বিহারের দেওঘর থেকে, বারীন এনট্র্যান্স পরীক্ষা পাশ করে ১৯০১ সালে পাটনা কলেজে
ভর্তি হন কিন্তু তাঁর প্রথাগত শিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যায় | এর পর কিছুকাল তিনি তাঁর মেজদা মনমোহন
ঘোষের কাছে কাটিয়ে, গুজরাতের বরোদায়, সেজদা অরবিন্দ ঘোষের কাছে চলে যান | সেখানে
অরবিন্দের বিপ্লবের ভাবনায় প্রভাবিত হয়ে, বন্দুক চালানো অভ্যাস করেন | এর পর তিনি অরবিন্দের
নির্দেশে চলে আসেন কলকাতায় এবং যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি বাঘাযতীন নাম খ্যাত হয়েছিলেন, এর
সাথে মিলে বিপ্লবী দল গঠন ও পরিচালনার কাজে লেগে পড়েন | দুজনে মিলে কলকাতায় বাংলার তরুণ
বিপ্লবীদের নিয়ে গড়ে তোলেন স্বদেশী আন্দোলনের মূল সংঘটন "অনুশীলন সমিতি" | ১৯০৬ সালে শুরু
করেন “যুগান্তর” সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা ব্রিটিশ বিরোধী পত্রিকা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে |

তাঁর নেতৃত্বে কলকাতার মানিকতলার মুরারীপুকুরে, তরুণ স্বদেশীদের বোমা তৈরি করার প্রশিক্ষণ দেওয়া
শুরু হয় | মানিকতলার মুরারীপুকুরের সেই জায়গাটি এখন “বোমার মাঠ” নামে খ্যাত | সেখানে বারীন
ঘোষদের বাগানবাড়ী ছিল | কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যার জন্য অতি গোপনীয়তার সঙ্গে নির্বাচিত করা হয়
দুই তরুনকে - প্রফুল্ল চাকী এবং ক্ষুদিরাম বোস |

১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল বিহারের মজঃফরপুরে, নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী ইংরেজ পুলিশ অফিসার -
কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যার চেষ্টায় ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বোস এবং প্রফুল্ল চাকী | দুর্ভাগ্যবশত কিংসফোর্ড
সেদিন ঐ ফিটন গাড়ীতে ছিলেন না | ছিলেন ইংরেজ মা ও মেয়ে, মিসেস ও মিস কেনেডি | প্রফুল্ল চাকীর
ছোঁড়া বোমায় ওই দুই ইংরেজ নারী মারা যান | কিশোর ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন বিহারের তত্কালীন
"ওয়াইনি" অধুনা "পুশা রোড" রেল স্টেশনে | বিহারের "মোকামাঘাট" রেল স্টেশনে, প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ার
ঠিক আগের মুহুর্তে নিজের মাথা লক্ষ্য করে নিজের পিস্তল থেকে গুলি চালান কিন্তু তখনই তিনি মারা যান
নি | তাঁকে হাস্পাতালে নিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টা হয় | জ্ঞান ফিরলে হাসপাতালের বেড-এই তিনি নাকি
তাঁর মাথার ব্যান্ডেজ খুলে ক্ষতের ভিতর আঙুল ঢুকিয়ে ঘিলু বার করার চেষ্টা করেন এবং মারা যান | এর
পর ব্রিটিশ সরকার এক সাংঘাতিক বর্ব্বরতার কাজ করে | প্রফুল্ল চাকীর সনাক্তকরণের জন্য ভাগলপুর
থেকে কলকাতা অবধি তাঁর মৃতদেহ বয়ে আনার ঝামেলা এড়ানোর জন্য তারা প্রফুল্ল চাকীর মাথাটা কেটে
কলকাতায় নিয়ে আসে | সনাক্তকরণের পর প্রফুল্লচাকীর মাথাটিকে নাকি ফ্রীস্কুল স্ট্রীটের থানার উঠোনে
পুতে দেওয়া হয় |

এই মামলায় ক্ষুদিরামের উকিল ছিলেন দেশপ্রেমিক আইনজীবী কালিদাস বসু | পরে বিচার চলাকালীন,
ক্ষুদিরাম দুঃখ প্রকাশ করেন দুজন নারীকে তাঁরা অজান্তে হত্যাকরে ফেলেছিলেন বলে, কিন্তু কিংসফোর্ডকে
মারার কথায় বলেন যে সুযোগ পেলে তিনি ওই কাজ আবার করবেন |

ক্ষুদিরামের মাতা ও পিতার অকাল মৃত্যুর পর তিনি কিছুদিন তাঁর দিদি অপরূপা দেবীর গৃহে আশ্রয়
পেয়েছিলেন | স্বদেশী করে বলে সরকারী চাকুরে জামাইবাবু অমৃতলাল রায় তাঁকে অন্যত্র ব্যবস্থা করতে
বলেন | সেই সময় তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁর পাতানো দিদি, মেদিনীপুরের উকিল সৈয়দ আবদুল
ওয়াজেদ এর বোন (এই স্নেহময়ী মহিয়সী নারীর নামটি আমাদের জানা নেই) | ফাঁসির আগে ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা
প্রথমে ছিল এই যে - তিনি বোমা বানাতে পারেন, অনুমতি পেলে ওটা সবাইকে শিখিয়ে যেতে চান!
বলাবহুল্য সে ইচ্ছা এককথায় বাতিল করে দিয়ে আবার জানতে চাওয়া হয় যে তাঁর শেষ ইচ্ছা কি | এবার
ক্ষুদিরাম জানান যে তাঁর দিদিকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে | দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয় নি কারণ
ইচ্ছা থাকলেও স্বামীর অমতে অপরূপা দেবী ভাই ক্ষুদিরামকে দেখে যেতে পারেন নি | কিন্তু সেদিন তাঁর
ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন তাঁর পাতানো মুসলমান দিদিটি | তিনি সব বাধা কাটিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন
মজঃফরপুরে ক্ষুদিরামের সাথে দেখা করতে |

এমন যে দেশে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে স্নেহ-ভালবাসার দৃষ্টান্ত রয়েছে, সে দেশে কী করে কথায় কথায় রায়ট
লাগে, কথায় কথায় দেশ ভাগ হয়, আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে তা বুঝে উঠতে পারিনি আজও! ক্ষুদিরাম বোস ও
প্রফুল্ল চাকীর প্রসঙ্গ এখানে আপাতভাবে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও আমরা মনে করছি যে এই ঘটনাবলী বারীন
ঘোষের জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ | তিনি না থাকলে কি এই ইতিহাস রচিত হোতো?

ক্ষুদিরামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১১ই অগাস্ট ১৯০৮ তারিখে | তিনি হাসতে হাসতেই ফাঁসির মঞ্চে
উঠেছিলেন | এ কথা আমরা দুটি সংবাদ পত্রের খবর থেকে জানতে পারি----

. মজঃফরপুর, ১১ই আগস্ট---অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে | ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল

চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয় | এমন কি তাহার মাথার উপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল |




এই সাইড সম্পর্কে কোন তথ্য জানতে অথবা আপনার মতামত দিতে email করুন
kobita10@yahoo.com
ধন্যবাদ