জয় গোস্বামী

হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে

 

অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে

হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে

 

করো আনন্দ আয়োজন করে পড়ো

লিপি চিত্রিত লিপি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সানুতলে

যে একা ঘুরছে, তাকে খুঁজে বার করো

 

করেছো, অতল; করেছিলে; পড়ে হাত থেকে লিপিখানি

ভেসে যাচ্ছিলভেসে তো যেতই, মনে না করিয়ে দিলে;

–’পড়ে রইল যে!পড়েই থাকতসে-লেখা তুলবে বলে

 

কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।।

স্নান

 

সংকোচে জানাই আজ: একবার মুগ্ধ হতে চাই

তাকিয়েছি দূর থেকেএতদিন প্রকাশ্যে বলিনি

এতদিন সাহস ছিল না কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার -

আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে

 

জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো

তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে বলে যে-প্রেমিক

ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান

হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে

 

আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি

ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি

আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল

অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?

 

শোনো, আমি রাত্রিচরআমি এই সভ্যতার কাছে

এখনো গোপন করে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;

সমস্ত যৌবন ধরে ব্যধিঘোর কাটেনি আমারআমি একা

দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,

জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোৼস্নার ধারণা দেব বলে

এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি

 

দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত -

যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;

সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে

তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার

পৃথিবী দেখুক, এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি

সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত করে রেখে

উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায়

নৌকো থেকে বৈঠা পড়ে যায়

 

নৌকো থেকে বৈঠা পড়ে যায়

জলের তলায়

 

কালো ছাইরঙা জল একবার ঢেউ দিয়ে অন্ধকার

 

এখন কোথায় আছে সেই বৈঠাখানি?

 

দুটো কৌতুহলী মাছ, দু খন্ড পাথর, লক্কড়, সাইকেল ভাঙা

গোল আংটির পাশে পাঁকে গাঁথা চারানা আট আনাঅন্ধকারে

ওদের চোখ জ্বলেএই জলে থেকে থেকে

এখন ওরাও কোন প্রাণী

 

হারানো বৈঠার কাছে পৌঁছে দেখি, তার

দুধারে জন্মেছে পাখনা, পিঠে কাঁটা, নাকে খড়গ, আর

খড়গের রজ্জুর সঙ্গে বৃহ‌ৎ নৌকোটি বেঁধে নিয়ে

বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে ঝাপসা জলমগ্ন ভূমন্ডল পেরিয়ে সে চলেছে আবার

বিবাহিতাকে

 

কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি আমার সামনে দাড়ালেই আমি

তোমার ভিতরে একটা বুনো ঝোপ দেখতে পাই

ওই ঝোপে একটা মৃতদেহ ঢাকা দেওয়া আছে

অনেকদিন ধরে আছেকিন্তু আশ্চর্য যে

এই মৃতদেহ জল, বাতাস, রৌদ্র ও সকলপ্রকার

কীট-বীজাণুকে প্রতিরোধ করতে পারেএর পচন নেই

বন্য প্রাণীরাও এর কাছে ঘেঁষে না

রাতে আলো বেরোয় এর গা থেকে

আমি জানি, মৃতদেহটা আমার

কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, এই জারিজুরি এবার ফাঁস হওয়া প্রয়োজন

আর তা হবেও, যেদিন চার পায়ে গুঁড়ি মেরে গিয়ে

পা কামড়ে ধরে, ওটাকে, ঝোপ থেকে

টেনে বার করব আমি

জলহাওয়ার লেখা

 

স্নেহসবুজ দিন

তোমার কাছে ঋণ

 

বৃষ্টিভেজা ভোর

মুখ দেখেছি তোর

 

মুখের পাশে আলো

ও মেয়ে তুই ভালো

 

আলোর পাশে আকাশ

আমার দিকে তাকা

 

তাকাই যদি চোখ

একটি দীঘি হোক

 

যে-দীঘি জ্যো‌ৎস্নায়

হরিণ হয়ে যায়

 

হরিণদের কথা

জানুক নীরবতা

 

নীরব কোথায় থাকে

জলের বাঁকে বাঁকে

 

জলের দোষ? — নাতো!

হাওয়ায় হাত পাতো!

 

হাওয়ার খেলা? সেকি!

মাটির থেকে দেখি!

 

মাটিরই গুণ? — হবে!

কাছে আসুক তবে!

 

কাছে কোথায়? — দূর!

নদী সমুদ্দুর

 

সমুদ্র তো নোনা

ছুঁয়েও দেখবো না

 

ছুঁতে পারিস নদী

শুকিয়ে যায় যদি?

 

শুকিয়ে গেলে বালি

বালিতে জল ঢালি

 

সেই জলের ধারা

ভাসিয়ে নেবে পাড়া

 

পাড়ার পরে গ্রাম

বেড়াতে গেছিলাম

 

গ্রামের কাছে কাছে

নদীই শুইয়ে আছে

 

নদীর নিচে সোনা

ঝিকোয় বালুকণা

 

সোনা খুঁজতে এসে

ডুবে মরবি শেষে

 

বেশ, ডুবিয়ে দিক

ভেসে উঠবো ঠিক

 

ভেসে কোথায় যাবো?

নতুন ডানা পাবো

 

নামটি দেবো তার

সোনার ধান, আর

 

বলবোঃ শোন, এই

কষ্ট দিতে নেই

 

আছে নতুন হাওয়া

তোমার কাছে যাওয়া

 

আরো সহজ হবে

কত সহজ হবে

 

ভালোবাসবে তবে? বলো

কবে ভালোবাসবে?

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়

 

বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো

বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?

বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে

বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে

ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর

বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর

আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি

আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি

 

বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো

শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো

তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে

বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে

কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী

সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি

আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল

ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলো

 

বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে

সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে?

সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে?

আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে

দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো!

স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো

জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ

বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক

 

রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে

মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে

আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে

মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে

আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি

আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি

তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই?

কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?

শাসকের প্রতি

 

আপনি যা বলবেন

আমি ঠিক তাই কোরবো

তাই খাবো

তাই পরবো

তাই গায়ে মেখে ব্যাড়াতে যাবো

কথাটি না বলে

বললে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকবো সারা রাত

তাই থাকবো

পরদিন যখন বলবেন

এবার নেমে এসো

তখন কিন্তু লোক লাগবে আমাকে নামাতে

একা একা নামতো পারবো না

ও টুকু পারি নি বলে

অপরাধ নেবেন না যেন

তুমি আর তোমার ক্যাডার

 

দলে দলে মোটর বাইকে ঢুকে পড়ে

কারা ঢুকে পড়ে ভোর বেলা

কারা ঢুকে পড়ে

জানা যায় না

কিন্তু তারই পরে

এ গ্রামে, ও গ্রামে, ঘরে ঘরে

অবাধে কৃষক-রক্ত ঝরে

জাগ্রত কৃষক রক্ত ঝরে

 

অস্ত্র প্রয়োগের অধিকারী

তুমি আর তোমার ক্যাডার

আমরা শুধু খুন হতে পারি

মুখ বুজে খুন হতে পারি

এই একমাত্র অধ

ভরত মণ্ডলের মা

 

বৃদ্ধা বললেন:

আমার এক ছেলে গেছে,

আরেক ছেলে কে নিয়ে যাক

জমি আমি দেব না ওদের |

এই যে হাত দুটো দেখছো বাবা…’

লে তাঁর কাঁপা কাঁপা

শিরা ওঠা হাত দুটি উঠিয়ে

দেখালেন: এ দুটো হাতে

ক্ষেতের সমস্ত কাজ

এতদিন করেছি, এবার

এই হাত দুটো দিয়েই

জমি কেড়ে নেওয়া আটকাবো|’

 

মাসীমা, আপনার নেই

ইটভাটার অস্ত্রভাণ্ডার

মাসীমা, আপনার নেই

সশস্ত্র পুলিশ

মাসীমা, আপনার নেই

পুলিশ-পোষাক পরা

চটি পায়ে হাজার ক্যাডার

তা সত্বেও এত শক্তি

কোথা থেকে পান?

 

তা আমরা জানি না

শুধু এইটুকু জানি

 

কৃষকজননী হয়ে মাঝে মাঝে দেবী দুর্গা

আমাদের দেখা দি

কে বেশি কে কম

 

চিনতে পেরে গেছে বলে যার জিভ

কেটে নিল ধর্ষণের পরে

দুহাতে দুটো পা ধরে

ছিঁড়ে ফেললো যার শিশুটিকে

ঘাড়ে দুটো কোপ মেরে যার স্বামীকে

ফেলে রাখলো উঠোনের পাশে

মরা অবধি মুখে জল দিতে দিল না

সেই সব মেয়েদের ভেতরে

যে-শোকাগ্নি জ্বলছে

সেই আগুনের পাশে

এনে রাখো গুলির অর্ডার দেওয়া

শাসকের দুঘন্টা বিষাদ

তারপর মেপে দ্যাখো

কে বেশি কে কম

তারপর ভেবে দেখ

কারা বলেছিল

জীবন নরক করব, প্রয়োজনে

প্রাণে মারব, প্রাণে!

 

এই বলে ময়ূর আজ

মুখে রক্ত তুলে

নেচে যায় শ্মশানে শ্মশানে

 

আর সেই নৃত্য থেকে দিকে দিকে

ছিটকে পড়ে জ্বলন্ত পেখম |

স্বেচ্ছা

 

ওরা তো জমি দিয়েছে স্বেচ্ছায়

ওরাতো ঘর ছেড়েছে স্বেচ্ছায়

লাঠির নিচে ওরা তো স্বেচ্ছায়

পেতেছে পিঠ, নীচু করেছে মাথা

 

তোমরা কেন দেখতে পাও না তা

 

দেখেছি, সবই দেখেছি স্বেচ্ছায়

বাধ্য হয়ে দেখেছি স্বেচ্ছায়

মানব অধিকারের শবদেহ

বানের জলে দেখেছি ভেসে যায়

 

রাজ-আদেশে হাতকড়া-পড়ানো

রক্তঝরা গণতন্ত্রটিকে

প্রহরীদল হাঁটিয়ে নিয়ে যায়

প্রহরীদল মশানে নিয়ে যায়

 

আমরা সব দাঁড়িয়ে রাজপথে

দেখেছি, শুধু দেখেছি স্বেচ্ছায়

শিল্প

 

জমি কেড়ে নেওটাই কাজ

ঘর ছাড়া করাটাই কাজ

আমাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে

তাড়াও, তারপর তৈরি করো

আমাদেরই বুকের উপরে

উঁচু শিল্প, উদ্ধত সমাজ |

 

সঙ্গে কিন্তু পুলিশকেও চাই

নাহলে কি করে ছলে বলে

আমার হাড়গোড় ভাঙবে, ভাই!

 

গণতন্ত্র আজ থেকে এটাই

গণতন্ত্র আজ থেকে এটাই |

বলি

 

অনামিকা কই? কাজল কোনদিকে গেল?

সায়ন কোথায়?

পিছনে তাকিয়ে দেখি সঙ্গে কেউ নেই

প্রান্তরের মধ্যে এক যূপকাষ্ঠঅর্ধেক প্রোথিত

ধারে কাছে কোনও ধড় নেই

মুণ্ডুরা উধাও |

ধুলোয় শোওয়ানো আছে খাঁড়া |

চেনে চেনে লাগে বড় |

ইতি পূর্বে দেখা হয়েছে কি?

সত্তর একাত্তর বাহাত্তর সালে

এঁদের দেখেছি বটে |

তারপর কি কোখাও দেখিনি?

হ্যাঁ মনে পড়েছে |

লালাবাজারে এই খাঁড়া ঝোলানো রয়েছে |

যূপকাষ্ঠ আছে মহাকরণের বুদ্ধিঘরে |

সোজা কথা

 

(‘কার কী ক্ষমতা আছে দেখি এবার | ওরা মাঠে নামছে | আমরাও নামব | …কার কী ক্ষমতা দেখিঅতীতেও এমন অবস্থা হয়েছে | তবে এখন আমাদের ক্ষমতা অনেক বেশি রবিবার ১১ মার্চ ২০০৭, কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউণ্ডে পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কৃষকসভার সমাবেশে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত ভাষণের অংশ | )

 

গুলি লেগে পড়ে গেল |

তুলে ধরতে যাচ্ছে তার বউ |

বন্দুক উঁচিয়ে ধরো |

বলোনা, তুলবি না—’

বলোযা সরে যা বলছি—’ তাও

যদি না শোনে তাহলে

স্বামীর সাহায্যকারী হাতদুটোয়

সোজা গুলি করো |

যে-নারী ধর্ষণ করতে বাধা দিচ্ছে তার

যৌনাঙ্গে লাঠির মাথা সোজা ভরে দাও

যন্ত্রণায় সে যখন দয়া চায়, গালাগালি করে

তার সামনে তার শিশুটিকে দুপা ধরে

দুই দিকে টানো,

টানো,

যতক্ষণ না সোজাসুজি ছিঁড়ে যাচ্ছে

টানো!

একে বলে সোজা কথা |

এরই নাম ক্ষমতা দেখানো!

আইনশৃঙ্খলা

 

(‘নন্দীগ্রামে, আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য, আজ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে |’ ১৪ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর বক্তব্যের অংশ | )

 

কপালে স্টিকার আঁটা : সুকুমার গিরি |

বুকে মস্ত ছ্যাঁদা নিয়ে চিত হয়ে আছে

তমলুক হাস্পাতালে |

ঢাক্তার বুঝেছেন

এ লোকটাকে বেডে তুলতে গেলেই

এক্ষুনি মরে যাবে |

ঠিক | গেল তাই | কিন্তু, ছেলে তার

বুঝছে না এখনো |

বলছে, ‘বাবু, পায়ে পড়ি,

বাবাকে বাঁচান |

ডাক্তার কি করবে আর!

ওর ছেলে জানেও না

লিডারের কয়েকটি কথায়

নির্দেশিত আমাদের শোয়া বসা

হাঁটা চলা মরা আর বাঁচা

আমাদের কাজ শুধু মর্গা আর হাসপাতালে

পুলিশের গুলি খাওয়া মৃতদেহ হয়ে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা |

বাংলার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে

 

বাংলার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে,

রক্ত

গড়িয়ে পড়ছে

কেউ ছুটে গেল খালের ওদিকে

বুক ফাটা গলায় কার মা ডাকল : রবি রে…”

উত্তরের পরিবর্তে, অনেকের স্বর মিলে একটি প্রকাণ্ড হাহাকার

ঘুরে উঠল

 

কে রবি? কে পুষ্পেন্দু? ভরত?

কাকে খুঁজে পাওয়া গেছে? কাকে আর পাওয়া যায় নি?

কাকে শেশ দেখা গেছে

ঠেলাঠেলি জনতাগভীরে?

 

রবি তো পাচার হচ্ছে লাশ হয়ে আরও সর লাশেদের ভিড়ে

 

বাংলার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে

রক্ত

গড়িয়ে পড়েছে

রক্ত

গড়িয়ে পড়েছে

 

পিছনে কুকুর ছুটছে

ধর্, ধর্

পিছনে শেয়াল

 

তার পিছু পিছু আসছে ভাণ্ড হাতে

রাজ অনুচর

 

এই রক্ত ধরে রাখতে হবে

 

এই রক্ত মাখা হবে সিমেন্টে বালিতে

গড়ে উঠবে সারি সারি

কারখানা ঘর

তারপর

চারবেলা ভোঁ লাগিয়ে সাইরেন বাজবে

 

এ কাজ না যদি পার, রাজা

তাহলে

বণিক এসে তোমার গা থেকে

শেষ লজ্জাবস্ত্রটুকু খুলে নিয়ে যাবে

 

আমার গুরুত্ব ছিল মেঘে

প্রাণচিহ্নময় জনপদে

আমার গুরুত্ব ছিল

গা ভরা নতুন শস্য নিয়ে

রাস্তার দুপশ থেকে চেয়ে থাকা আদিগন্ত ক্ষেতে আর

মাঠে

আমার গুরুত্ব ছিল

আজ

আমার গুরুত্ব শুধু রক্তস্নানরত

হাড়িকাঠে!

 

অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে

সূর্য উঠে আসে

 

বন্ধ থাকা ইশ্কুলের গায়ে ও মাথায়

রোদ পড়ে

 

রোদ পড়ে মাটি খুড়ে চলা

কোদালে, বেলচায়

 

রোদ পড়ে নিখোঁজ বাচ্চার

রক্তমাখা স্কুলের পোশাকে

 

না, না, না, না, না

না বলে চিত্কার করছে গাছ

না বলে চিত্কার করছে এই গ্রীষ্ম দুপুরের হাওয়া

না বলে চিত্কার করছে পিঠে লাশ বয়ে নিয়ে চলা

ভ্যান গাড়ি

 

আর আমরা শহরের কয়েকজন গম্ভীর মানুষ

ভেবে দেখছি না বলার ভাষারীতি ঠিক ছিল কিনা তাই নিয়ে

আমরা কি বিচারে বসতে পারি?

 

তুমি কি খেজুরি? তুমি ভাঙাবেড়া?

সোনাচূড়া তুমি?

বার বার প্রশ্ন করি | শেষে মুখে রক্ত উঠে আসে |

 

আমার প্রেমের মতো ছাড়খার হয়ে আছে আজ গোটা দেশ

ঘোর লালবর্ণ অবিশ্বাসে |

 

আমরা পালিয়ে আছি

আমরা লুকিয়ে আছি দল বেঁধে এই

ইটভাটায়

মাথায় কাপড় ঢেকে সন্ধ্যেয় বেরোই

মন্টুর আড়তে

মল্লিকের

বাইকের পিছন-সিটে বসে

আমরা এক জেলা থেকে অপর জেলায়

চলে যাই,

যখন যেখানে যাই কাজ তো একটাই |

লোক মারতে হবে |

আপাতত ইটভাঁটায়

লুকিয়ে রয়েছি

অস্ত্র নিয়ে

কখন অর্ডার আসে, দেখি |

 

পিছু ফিরে দেখেছি পতাকা |

সেখানে রক্তের চিহ্ন, লাল |

 

বছর আগে যারা তোমাকে সাহায্য করবে বলে

বছর আগে যারা তোমার সাহায্য পাবে বলে

রক্তিম পতাকটিকে নিজের পতাকা ভেবে কাঁধে নিয়েছিল

 

তাঁদের সবাইকে মুচড়ে দলে পিষে ভেঙে

দখল করেছ মুক্তাঞ্চল

 

পতাকাটি সেই রক্তবক্ষ পেতে ধারণ করলেন |

 

তোমার কি মনে পড়ছে রাজা

শেষ রাত্রে ট্যাঙ্কের আওয়াজ?

মনে পড়ছে আঠারো বছর আগে তিয়েন-আন-মেন?

 

ভাসছে উপুর হয়ে | মুণ্ডু নেই | গেঞ্জি পড়া কালো প্যান্ট |

কোন বাড়ির ছেলে?

নব জানে | যারা ওকে কাল বিকেলে বাজারে ধরেছে

তার মধ্যে নবই তো মাথা |

 

একদিন নব-র মাথাও

গড়াবে খালের জলে,

ডাঙায় কাদার মধ্যে উলটে পড়ে থাকবে স্কন্ধকাটা

এ এক পুরনো চক্র |

এই চক্র চালাচ্ছেন যে-সেনাপতিরা

তাঁদের কি হবে?

 

উজ্জ্বল আসনে বসে মালা ও মুকুট পরবে

সেসব গর্দান আর মাথা

 

এও তো পুরনো চক্র | কিন্তু তুমি ফিরে দেখ আজ

সে চক্র ভাঙার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছে গ্রাম

ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতা |

 

১০

অপূর্ব বিকেল নামছে |

রোদ্দুর নরম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা মাঠে |

রোদ্দুর, আমগাছের ফাঁক দিয়ে নেমেছে দাওয়ায় |

শোকাহত বাড়িটিতে

শুধু এক কাক এসে বসে |

ডাকতে সাহস হয় না তারও |

 

অনেক কান্নার পর পুত্রহারা মা বুঝি এক্ষুনি

ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন |

যদি ঘুম ভেভে যায় তাঁর!