মোফাজ্জল করিম

নেশা

 মোফাজ্জল করিম

 

 

বাপজান আশা করি কুশলেই আছেন,

পরসমাচার এই যে,

সেদিন আপনি যে কান্ডটা করিলেন

তার জন্য এই পত্রটি না লিখিয়া পারিতেছিনা

দেখিতেছি যতই বয়স বাড়িতেছে, ততই আপনার কান্ড

একেবারেই লোপ পাইতেছে!

 

আপনি কি করিয়া সেদিন আমার ড্রইংরুমে,

অর্থাৎ বৈঠকখানায় বেমোক্কা ঢুকিয়া পড়িলেন,

বুঝিলাম না

সারাগায়ে ঘামের গন্ধ, ময়লা তেল চিপচিপে পান্ঞ্জাবী,

বগলে ছেঁড়া ছাতা, মাথায় চিতিপড়া কিস্তি টুপি,

যেনো আকবর বাদশার উর্নিশ আর কি!

হাতে মাটির হাড়ি, সর্বোপরি দু'পায়ের চামড়ার

কুচ কুচে কালো রং, বোধহয় লজ্জায় ঢাকিয়া ফেলিবার

আশায়, রাস্তার সবটুকু ধুলি মাখাইয়া

পা দু'টিকে মনে হইতেছিল চুনকাম করাইয়াছেন।

কি লজ্জা, আপনার ঐমূর্তি দেখিয়া আমার বন্ধুগন

এবং তাদের সুন্দরী স্ত্রীরা, বজ্রাহতের মতো তাকাইয়া রহিলো।

যেনো তাহারা চাক্ষুস ভুত দেখিতেছে

আর আমার অবস্হাটা একবার ভাবিয়া দেখুন,

মান, সম্মান, মর্যাদা সব জাহান্নামে গেল,

তাও-না হয়, আপনি যদি দয়া করিয়া একটু চুপ থাকিতেন

তবু একটা কথা ছিল!

তা-না আপনার আবার আহল্লাদে মুখ দিয়া

কথার ফোয়ারা ছুটিতে লাগিলোঃ

"বাবা কেমন আছো? বৌমা কোথায়?"

বলিহারে ভাগ্যিস সেই মুহুর্তে ও সেখানে ছিল না!

থাকিলে সে বেচারির হার্ট এটাক হইয়া যাইতো,

সে তো আবার হঠাৎ কোনো খারাপ দৃশ্য

মোটেই সহ্য করিতে পারেনা,

বড় কোমল হৃদয়ের মানুষ কিনা!

বাপজান তোমাকে সাবধান করিয়া দিতেছি

আর যাই করো, এইভাবে আমাকে ডুবাইয়ো না

টাকা-পয়সা লাগিলে চিঠি দিও পারিলে পাঠাইবো,

আর অতো টাকা পয়সাও যে কেন লাগে তোমাদের তাও বুঝিনা

তোমাদের আবার অতো খরচ কিসের

ক্লাবে যাওনা, পার্টি দাওনা

ইসুবগুল, আর চিরতার পানি ছাড়া

আরতো কোনো নেশাও করো না।

 

এইটুকু পড়িয়া দরিদ্র স্কুল মাস্টার

পিতা আনমনে বলিয়া উঠিলেনঃ

না, না ভুল বললিরে বাবা

নেশা একটা আছে, বড় পুরানো নেশা

কিছুতেই ছাড়িতে পারিনা সেই নেশা

তোর জন্মের পর থেকে সারাক্ষণ তোকে দেখার নেশা

কিছুতেই ছাড়িতে পারিনা বাপ, কিছুতেই ছাড়িতে পারিনা।।