মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বঙ্গভাষা

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন; -

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি।

অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ,

মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি; -

কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল-কানন!

স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে -

"ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,

এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?

যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে!"

পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে

মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।

কপোতাক্ষ নদ

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

সতত, হে নদ তুমি পড় মোর মনে

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।

সতত যেমনি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া যন্ত্র ধ্বনি তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।

বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে

দুগ্ধস্রোতরূপি তুমি মাতৃভূমি স্তনে।

আর কি হে হবে দেখা যত দিন যাবে

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে

বারি রূপ কর তুমি এ মিনতি গাবে

বঙ্গজ জনের কানে সখে-সখারিতে।

নাম তার এ প্রবাসে মজি প্রেমভাবে

লইছে যে নাম তব বঙ্গের সঙ্গীতে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।

করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,

দীন যে, দীনের বন্ধু !– উজ্জল জগতে

হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।

কিন্তু ভাগ্য-বলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,

যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,

সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে

গিরীশ। কি সেবা তার সে সুখ সদনে !

দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী।

যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে

দীর্ঘ-শিরঃ তরু-দল, দাসরূপ ধরি।

পরিমলে ফুল-কুল দশ দিশ ভরে,

দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,

নিশায় সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে।

উপক্রম

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

যথাবিধি বন্দি কবি, আনন্দে আসরে,

কহে, জোড় করি কর, গৌড় সুভাজনে;---

সেই আমি, ডুবি পূর্বে ভারত-সাগরে,

তুলিল যে তিলোত্তমা-মুকুতা যৌবনে;---

কবি-গুরু বাল্মীকির প্রসাদে তৎপরে,

গম্ভীরে বাজায়ে বীণা, গাইল, কেমনে,

নাশিলা সুমিত্রা-পুত্র, লঙ্কার সমরে,

দেব-দৈত্য-নরাতঙ্ক--- রক্ষেন্দ্র-নন্দনে;

কল্পনা দূতীর সাথে ভ্রমি ব্রজ-ধামে

শুনিল যে গোপিনীর হাহাকার ধ্বনি,

(বিরহে বিহ্বলা বালা হারা হয়ে শ্যামে;)---

বিরহ-লেখন পরে লিখিল লেখনী

যার, বীর জায়া-পক্ষে বীর পতি-গ্রামে,

সেই আমি, শুন, যত গৌড়-চূড়ামণি!---

 

ইতালি, বিখ্যাত দেশ, কাব্যের কানন,

বহুবিধ পিক যথা গায় মধুস্বরে,

সঙ্গীত-সুধার রস করি বরিষণ,

বাসন্ত আমোদে আমোদ মন পূরি নিরন্তরে;---

সে দেশে জনম পূর্বে করিলা গ্রহণ

ফ্রাঞ্চিস্কো পেতরাকা কবি; বাক্দেবীর বরে

বড়ই যশস্বী সাধু, কবি-কুল-ধন,

রসনা অমৃতে সিক্ত, স্বর্ণ বীণা করে।

কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি,

স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে

কবীন্দ্র: প্রসন্নভাবে গ্রহিলা জননী

(মনোনীত বর দিয়া) এ উপকরণে।

ভারতে ভারতী-পদ উপযুক্ত গণি,

উপহাররূপে আজি অরপি রতনে॥

যশের মন্দির

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

সুবর্ণ-দেউল আমি দেখিনু স্বপনে

অতি-তুঙ্গ শৃঙ্গ শিরে! সে শৃঙ্গের তলে,

বড় অপ্রশস্ত সিঁড়ি গড়া মায়া-বলে,

বহুবিধ রোধে রুদ্ধ উর্দ্ধগামী জনে!

তবুও উঠিতে তথা-- সে দুর্গম স্থলে--

করিছে কঠোর চেষ্টা কষ্ট সহি মনে

বহু প্রাণী। বহু প্রাণী কাঁদিছে বিকেলে,

না পারি লভিতে যত্নে সে রত্ন-ভবনে।

ব্যথিল হৃদয় মোর দেখি তা সবারে।--

শিয়রে দাঁড়ায়ে পরে কহিলা ভারতী,

মৃদু হাসি; "ওরে বাছা, না দিলে শকতি

আমি, ও দেউলে কার সাধ্য উঠিবারে?

যশের মন্দির ওই; ওথা যার গতি,

অশক্ত আপনি যম ছুঁইতে রে তারে!''

কবি

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

কে কবি-- কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,

শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,

সেই কি সে যম-দমী? তার শিরোপরি

শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন?

সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী

যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন,

অস্তগামি-ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি

ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ।

আনন্দ, আক্ষেপ ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে

অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে;

নন্দন-কানন হতে যে সুজন আনে

পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে;

মরুভূমে-- তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে

বহে জলবতী নদী মৃদু কলকলে

মিত্রাক্ষর

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

বড়ই নিষ্ঠুর আমি ভাবি তারে মনে,

লো ভাষা, পীড়িতে তোমা গড়িল যে আগে

মিত্রাক্ষররূপ বেড়ি! কত ব্যথা লাগে

পর' যবে এ নিগড় কোমল চরণে--

স্মরিলে হৃদয় মোর জ্বলি উঠে রাগে

ছিল না কি ভাবধন, কহ, লো ললনে,

মনের ভাণ্ডারে তার, যে মিথ্যা সোহাগে

ভুলাতে তোমারে দিল এ তুচ্ছ ভূষণে?

কি কাজ রঞ্জনে রাঙি কমলের দলে?

নিজরূপে শশিকলা উজ্জ্বল আকাশে!

কি কাজ পবিত্রি' মন্ত্রে জাহ্নবীর জলে?

কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত-বাসে?

প্রকৃত কবিতা রূপী কবিতার বলে,--

চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ ফাঁসে?