জীবনানন্দ দাস

আবার আসিব ফিরে

জীবনানন্দ দাস

 

 

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে - এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয় - হয়তো বা শাঁখচিল শালিকের বেশে,

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিঁকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।

হয়তো বা হাঁস হবো - কিশোরীর - ঘুঙুর রহিবে লাল পায়

সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে

জলঙ্গীর ঢেউ এ ভেজা বাংলারি সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।

 

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।

হয়তো শুনিবে এক লক্ষীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে।

হয়তো খৈয়ের ধান সরাতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে।

রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে

ডিঙ্গা বায় - রাঙ্গা মেঘে সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে,

দেখিবে ধবল বক; আমারে পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।

বাংলার মুখ

জীবনানন্দ দাস

 

 

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ

খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে

চেয়ে দেখি ছাতার মতো ব্ড় পাতাটির নিচে বসে আছে

ভোরের দয়েলপাখি - চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ

জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশথের করে আছে চুপ;

ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;

মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে

এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ

 

দেখেছিল; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে -

কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় -

সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,

শ্যামার নরম গান শুনেছিল - একদিন অমরায় গিয়ে

ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়

বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।

আকাশলীনা

জীবনানন্দ দাস

 

 

সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়োনাকো তুমি,

বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;

ফিরে এসো সুরঞ্জনা :

নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;

 

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;

ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;

দূর থেকে দূরে - আরও দূরে

যুবকের সাথে তুমি যেয়োনাকো আর।

 

কী কথা তাহার সাথে? - তার সাথে!

আকাশের আড়ালে আকাশে

মৃত্তিকার মতো তুমি আজ :

তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।

 

সুরঞ্জনা,

তোমার হৃদয় আজ ঘাস :

বাতাসের ওপারে বাতাস -

আকাশের ওপারে আকাশ।

বনলতা সেন

 জীবনানন্দ দাস

 

 

 

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন ।

 

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর

হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন?'

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

 

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

ঘোড়া

 জীবনানন্দ দাস

 

 

আমরা যাইনি মরে আজও - তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয় :

মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;

প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন - এখনও ঘাসের লোভে চরে

পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর 'পরে।

 

আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়;

বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝরে পড়ে ইস্পাতের কলে;

চায়ের পেয়ালা ক'টা বেড়ালছানার মতো - ঘুমে-ঘেয়ো

                       কুকুরের অস্পষ্ট কবলে

 

হিম হয়ে নড়ে গেল ও - পাশের পাইস্-রেস্তরাঁতে,

প্যারাফিন-লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে।

                       সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;

এইসব নিওলিথ - স্তব্ধ তার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ

জীবনানন্দ দাস

 

 

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশী আজ চোখে দেখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজও মানুষের প্রতি,

এখনও যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাহাদের হৃদয়।

হায় চিল

জীবনানন্দ দাস

 

 

 

হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।

পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;

আবার তাহারে কেন ডেকে আনো?

কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

 

হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

আমি কবি-সেই কবি

 জীবনানন্দ দাস

 

 

আমি কবি-সেই কবি-

আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!

আন্‌মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে!

মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে!

বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে!

দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি!

 

স্বপন-সুরার ঘোরে

আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা ক'রে!

জন্ম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল না আমার সাধা-

পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা!

-নিমেষে পাসরি এই বসুধার নিয়তি-মানার বাধা

সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভ'রে!

 

ভুঁয়ের চাঁপাটি চুমি

শিশুর মতন, শিরীষের বুকে নীরবে পড়ি গো নুমি!

ঝাউয়ের কাননে মিঠা মাঠে মাঠে মটর-ক্ষেতের শেষে

তোতার মতন চকিতে কখন আমি আসিয়াছি ভেসে!

-ভাটিয়াল সুর সাঁঝের আঁধারে দরিয়ার পারে মেশে,-

বালুর ফরাশে ঢালু নদীটির জলে ধোঁয়া ওঠে ধূমি!

 

বিজন তারার সাঁঝে

আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে!

প'ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়!

হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়!

কোন্ যেন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর

কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে অকাজের মাঝে!

নীলিমা

জীবনানন্দ দাস

 

রৌদ্র ঝিল্‌মিল,

উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল,

অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে

নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে!

-উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী,

উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি,

আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা,

মরীচিকা-ঢাকা!

অগণন যাত্রিকের প্রাণ

খুঁজে মরে অনিবার, পায় নাকো পথের সন্ধান;

চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল-

হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল

তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী।

জনতার কোলাহলে একা ব'সে ভাবি

কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি

বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী!

স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা

মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা!

চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধ ধরণীর রুধির-লিপিকা

জ্বলে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা!

বসুধার অশ্রু-পাংশু আতপ্ত সৈকত,

ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল, নিষ্করুণ এই রাজপথ,

লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,

এই ধূলি-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার

ডুবে যায় নীলিমায়-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে,

-শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে;

ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক,

তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!

নাবিক

জীবনানন্দ দাস

 

 

কবে তব হৃদয়ের নদী

বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি!

সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে

দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে

বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন!

পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন!

কারাগার-মর্মরের তলে

নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে

ভ'রে যায় বসুধার আহত আকাশ!

অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস!

-সহস্রের অঙুলিতর্জন

নিত্য সহিতেছি মোরা-বারিধির বিপ্লব-গর্জন

বরিয়া লয়েছ তুমি, তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো;

তোমার পক্ষরতলে টগ্‌বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!-

তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার,

অবগুণ্ঠিতার

হিমকৃষ্ণ অঙুলির কঙ্কাল-পরশ

পরিহরি গেলে তুমি-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস

তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা

চকিতে চূর্ণিয়া গেলে-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা

বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট,

তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট

তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি!

নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি!

প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি!

ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,-

অগাধের সাধ

তোমারে সাজায়ে দেছে ঘরছাড়া ক্ষ্যাপা সিন্দবাদ!

মণিময় তোরণের তীরে

মৃত্তিকায় প্রমোদ-মন্দিরে

নৃত্য-গীত-হাসি-অশ্রু-উৎসবের ফাঁদে

হে দুরন্ত দুর্নিবার-প্রাণ তব কাঁদে!

ছেড়ে গেলে মর্মন্তুদ মর্মর বেষ্টন,

সমুদ্রের যৌবন-গর্জন

তোমারে ক্ষ্যাপায়ে দেছে, ওহে বীর শের!

টাইফুন্-ডঙ্কার হর্ষে ভুলে গেছ অতীত-আখের

হে জলধি পাখি!

পে তব নাচিতেছে ল্যহারা দামিনী-বৈশাখী!

ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রতœচূড় ময়ূখের টিপ,

কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ

করিতেছে বিভ্রান্ত তোমারে!

বিচিত্র বিহঙ্গ কোন্ মণিময় তোরণের দ্বারে

সহর্ষ নয়ন মেলি হেরিয়াছ কবে!

কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে-

স্তম্ভিত নয়নে

নীল বাতায়নে

তাকায়েছ তুমি!

অতি দূর আকাশের সন্ধ্যারাগ-প্রতিবিম্বে প্রস্ফুটিত সমুদ্রের

আচম্বিত ইন্দ্রজাল চুমি

সাজিয়াছ বিচিত্র মায়াবী!

সৃজনের জাদুঘর-রহস্যের চাবি

আনিয়াছ কবে উন্মোচিয়া

হে জল-বেদিয়া!

অল্য বন্দর পানে ছুটিতেছ তুমি নিশিদিন

সিন্ধু বেদুঈন!

নাহি গৃহ, নাহি পান্থশালা-

লক্ষ লক্ষ ঊর্মি-নাগবালা

তোমারে নিতেছে ডেকে রহস্যপাতালে-

বারুণী যেথায় তার মণিদীপ জ্বালে!

প্রবাল-পালঙ্ক-পাশে মীননারী ঢুলায় চামর!

সেই দুরাশার মোহে ভুলে গেছ পিছুডাকা স্বর

ভুলেছ নোঙর!

কোন্ দূর কুহকের কূল

লক্ষ্য করি ছুটিতেছে নাবিকের হৃদয়-মাস্তুল

কে বা তাহা জানে!

অচিন আকাশ তারে কোন্ কথা কয় কানে কানে!

বনের চাতক-মনের চাতক

জীবনানন্দ দাস

 

 

বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়-

মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়!

ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে-

সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে

বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়!

 

পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে, আগুনদানা ফাটে!

কোন্ ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে!

বাদল-বৌয়ের চুমার মৌয়ের সোয়াদ চেয়ে চেয়ে

বনের চাতক-মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে,

ঘাটের ভরা কলসি ও-কার কাঁদছে মাঠে মাঠে!

 

ওরে চাতক, বনের চাতক, আয় রে নেমে ধীরে

নিঝুম ছায়া-বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে,

"দে জল!" ব'লে ফোঁপাস কেন? মাটির কোলে জল

খবর-খোঁজা সোজা চোখের সোহাগে ছল্‌ছল্ !

মজিস নে রে আকাশ-মরুর মরীচিকার তীরে!

মনের চাতক, হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি

কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি?

ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে,

আতার ক্ষীরের মতো সোহাগ সেথায় ঘিরে আছে!

আয় রে ফিরে দানোয়-পাওয়া, আয় রে তাড়াতাড়ি।

 

বনের চাতক, মনের চাতক আসে না আর ফিরে,

কপোত-ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে!

সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ-শুঁড়িখানায় বাজে!

চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে

লুকিয়ে আছে সে-কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে!

আট বছর আগের এক দিন

 জীবনানন্দ দাস

 

 

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে

নিয়ে গেছে তারে;

কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে

 

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

মরিবার হল তার সাধ। বধূ শুয়ে ছিল পাশে - শিশুটিও ছিল;

প্রেম ছিল,আশা ছিল-জোৎসনায়,-তবে সে দেখিল

কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?

অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।

এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি!

 

রক্তফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইদুঁরের মত ঘাড় গুজি

আধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার;

কোনোদিন জাগিবেনা আর।

 

কোনোদিন জাগিবেনা আর।

জাগিবার গাঢ় বেদনার

অবিরাম - অবিরাম ভার

সহিবেনা আর -

এই কথা বলেছিলো তারে

চাঁদডুবে চ’লে গেলে - অদ্ভুদ আঁধারে

যেন তার জানালার ধারে

উটের গ্রীবার মতো কোন এক নিস্তব্ধতা এসে।

 

তবুও পেঁচা জাগে;

গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে।

আরেকটি প্রভাতের ইশারায় - অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে

টের পাই যুথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে

চারদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা

মশা তার অন্ধকার সংগ্রামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে

 

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রোদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;

সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি।

ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন - যেন কোন বির্কীন জীবন

অধিকার ক’রে আছে ইহাদের মন;

চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বথের কাছে

একগাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা - একা,

যে জীবন ফড়িঙের,দোয়েলের-মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা

এই জেনে।

 

অশ্বথের শাখা

করেনি কি প্রতিবাদ ? জোনাকির ভিড় এসে

সোনালী ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে

করেনি কি মাখামাখি?

থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে

বলেনি কি; ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে

চমৎকার !

ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!’

জানায়নি পেঁচা এসে এ-তুমুল গাড় সমাচার ?

 

জীবনের এই স্বাদ-সুপক্ক যবের ঘ্রান হেমন্তের বিকেলের-

তোমার অসহ্য বোধ হ’লো;

মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো

মর্গে - গুমোটে-

থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে।

শোনো

তবু এ মৃতের গল্প; কোনো

নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;

বিবাহিত জীবনের সাধ

কোথাও রাখেনি কোন খাদ,

সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধু

মধু-আর মননের মধু

দিয়েছে জানিতে;

হাড়হাবাতের গ্লানি বেদনার শীতে

এ-জীবন কোনদিন কেঁপে ওঠে নাই;

তাই

লাশকাটা ঘরে

চিৎ হ'য়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।

 

জানি - তবু জানি

নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয় -

আর এক বিপন্ন বিষ্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে,

ক্লান্ত - ক্লান্ত করে;

লাশকাটা ঘরে

সেই ক্লান্তি নাই;

তাই

লাশকাটা ঘরে

চিৎ হ'য়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।

 

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি,আহা,

থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে,

চোখ পাল্টায়ে কয়: ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে ?’

চমৎকার !

ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার-

 

হে প্রগাঢ় পিতামহী,আজো চমৎকার ?

আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো-বুড়ি চাঁদটারে আমি

ক’রে দিবো কালীদহে বেনোজলে পার;

আমরা দুজনে মিলে শূন্য ক’রে চ’লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

সে

 জীবনানন্দ দাস

 

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;

বলেছিলোঃ 'এ নদীর জল

তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল;

সব ক্লান্তি রক্তের থেকে

স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;

এই নদী তুমি।'

 

'এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?'

মাছরাঙাদের বললাম;

গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।

আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;

জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে

কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।

 

সময়ের অবিরল শাদা আর কালো

বনানীর বুক থেকে এসে

মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে

ঢের আগে নারী এক - তবু চোখ ঝলসানো আলো

ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি

না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।

 

স্মৃতি

 জীবনানন্দ দাস

 

 

থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি-

বললে, আমি অতীত ক্ষুধা-তোমার অতীত স্মৃতি!

-যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়বাদলের জলে,

শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে,

ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে;

তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে!

কাঁদছে তোমার মনের খাকে, চাপা ছাইয়ের তলে,

কাঁদছে তোমার স্যাঁত্সেঁতে শ্বাস-ভিজা চোখের জলে,

কাঁদছে তোমার মূক মমতার রিক্ত পাথার ব্যেপে,

তোমার বুকের খাড়ার কোপে, খুনের বিষে ক্ষেপে!

আজকে রাতে কোন্ সে সুদূর ডাক দিয়েছে তারে,-

থাকবে না সে ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে!

মুক্তি আমি দিলেম তারে-উল্লাসেতে দুলে

স্মৃতি আমার পালিয়ে গেল বুকের কপাট খুলে

নবালোকে-নবীন উষার নহবতের মাঝে।

ঘুমিয়েছিলাম, দোরে আমার কার করাঘাত বাজে!

-আবার আমায় ডাকলে কেন স্বপনঘোরের থেকে!

অই লোকালোক-শৈলচূড়ায় চরণখানা রেখে

রয়েছিলাম মেঘের রাঙা মুখের পানে চেয়ে,

কোথার থেকে এলে তুমি হিম সরণি বেয়ে!

ঝিম্‌ঝিমে চোখ, জটা তোমার ভাসছে হাওয়ার ঝড়ে,

শ্মশানশিঙা বাজল তোমার প্রেতের গলার স্বরে!

আমার চোখের তারার সনে তোমার আঁখির তারা

মিলে গেল, তোমার মাঝে আবার হলেম হারা!

-হারিয়ে গেলাম ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে;

কাঁদছে স্মৃতি-কে দেবে গো-মুক্তি দেবে তারে!

অস্তচাঁদে

জীবনানন্দ দাস

 

ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী!

-অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী,

নিঝ্ঝুম বিছানার পরে

মেঘবৌ'র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,-

চেয়ে থাকি চোখ তুলে'-যেন মোর পলাতকা প্রিয়া

মেঘের ঘোমটা তুলে' প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া!

সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে' ফিরে' ফিরে'

মাঠে ঘাটে একা একা, -বুনোহাঁস-জোনাকির ভিড়ে!

দুশ্চর দেউলে কোন্-কোন্ যক্ষ-প্রাসাদের তটে,

দূর উর-ব্যাবিলোন-মিশরের মরুভূ-সঙ্কটে,

কোথা পিরামিড তলে, ঈসিসের বেদিকার মূলে,

কেউটের মতো নীলা যেইখানে ফণা তুলে উঠিয়াছে ফুলে,

কোন্ মনভুলানিয়া পথচাওয়া দুলালীর মনে

আমারে দেখেছে জোছনা-চোর চোখে-অলস নয়নে!

আমারে দেখেছে সে যে আসরীয় সম্রাটের বেশে

প্রাসাদ-অলিন্দে যবে মহিমায় দাঁড়ায়েছি এসে-

হাতে তার হাত, পায়ে হাতিয়ার রাখি

কুমারীর পানে আমি তুলিয়াছি আনন্দের আরক্তিম আঁখি!

ভোরগেলাসের সুরা-তহুরা, ক'রেছি মোরা চুপে চুপে পান,

চকোরজুড়ির মতো কুহরিয়া গাহিয়াছি চাঁদিনীর গান!

পেয়ালায়-পায়েলায় সেই নিশি হয় নি উতলা,

নীল নিচোলের কোলে নাচে নাই আকাশের তলা!

নটীরা ঘুমায়েছিল পুরে পুরে, ঘুমের রাজবধূ-

চুরি করে পিয়েছিনু ক্রীতদাসী বালিকার যৌবনের মধু!

সম্রাজ্ঞীর নির্দয় আঁখির দর্প বিদ্রূপ ভুলিয়া

কৃষ্ণাতিথি-চাঁদিনীর তলে আমি ষোড়শীর উরু পরশিয়া

লভেছিনু উল্লাস-উতরোল!-আজ পড়ে মনে

সাধ-বিষাদের খেদ কত জন্মজন্মান্তের, রাতের নির্জনে!

 

আমি ছিনু 'ক্রবেদুর' কোন্ দূর 'প্রভেন্স্'-প্রান্তরে!

-দেউলিয়া পায়দল্-অগোচর মনচোর-মানিনীর তরে

সারেঙের সুর মোর এমনি উদাস রাত্রে উঠিত ঝঙ্কারি!

আঙুরতলায় ঘেরা ঘুমঘোর ঘরখানা ছাড়ি

ঘুঘুর পাখনা মেলি মোর পানে আসিল পিয়ারা;

মেঘের ময়ূরপাখে জেগেছিল এলোমেলো তারা!

-'অলিভ' পাতার ফাঁকে চুন চোখে চেয়েছিল চাঁদ,

মিলননিশার শেষে-বৃশ্চিক, গোক্ষুরাফণা, বিষের বিস্বাদ!

 

স্পেইনের 'সিয়েরা'য় ছিনু আমি দস্যু-অশ্বারোহী-

নির্মম-কৃতান্ত-কাল-তবু কী যে কাতর, বিরহী!

কোন্ রাজনন্দিনীর ঠোঁটে আমি এঁকেছিনু বর্বর চুম্বন!

অন্দরে পশিয়াছিনু অবেলার ঝড়ের মতন!

তখন রতনশেজে গিয়েছিল নিভে মধুরাতি,

নীল জানালার পাশে-ভাঙা হাটে-চাঁদের বেসাতি।

চুপে চুপে মুখে কার পড়েছিনু ঝুঁকে!

ব্যাধের মতন আমি টেনেছিনু বুকে

কোন্ ভীরু কপোতীর উড়ু-উড়ু ডানা!

-কালো মেঘে কেঁদেছিল অস্তচাঁদ-আলোর মোহানা!

 

বাংলার মাঠে ঘাটে ফিরেছিনু বেণু হাতে একা,

গঙ্গার তীরে কবে কার সাথে হয়েছিল দেখা!

'ফুলটি ফুটিলে চাঁদিনী উঠিলে' এমনই রূপালি রাতে

কদমতলায় দাঁড়াতাম গিয়ে বাঁশের বাঁশিটি হাতে!

অপরাজিতার ঝাড়ে- নদীপারে কিশোরী লুকায়ে বুঝি!-

মদনমোহন নয়ন আমার পেয়েছিল তারে খুঁজি!

তারই লাগি বেঁধেছিনু বাঁকা চুলে ময়ূরপাখার চূড়া,

তাহারই লাগিয়া শুঁড়ি সেজেছিনু-ঢেলে দিয়েছিনু সুরা!

তাহারই নধর অধর নিঙাড়ি উথলিল বুকে মধু,

জোনাকির সাথে ভেসে শেষরাতে দাঁড়াতাম দোরে বঁধু!

মনে পড়ে কি তা!-চাঁদ জানে যাহা, জানে যা কৃষ্ণাতিথির শশী,

বুকের আগুনে খুন চড়ে-মুখ চুন হয়ে যায় একেলা বসি!

বেদিয়া

জীবনানন্দ দাস

 

 

চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি!

পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি?

উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে,

গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে;

নয় সে বান্দা রংমহলের, মোতিমহলের বাঁদী,

ঝোড়ো হাওয়া সে যে, গৃহপ্রাঙ্গণে কে তারে রাখিবে বাঁধি!

কোন্ সুদূরের বেনামী পথের নিশানা নেছে সে চিনে,

ব্যর্থ ব্যথিত প্রান্তর তার চরণচিহ্ন বিনে!

যুগযুগান্ত কত কান্তার তার পানে আছে চেয়ে,

কবে সে আসিবে ঊষর ধূসর বালুকা-পথটি বেয়ে

তারই প্রতীক্ষা মেগে ব'সে আছে ব্যাকুল বিজন মরু!

দিকে দিকে কত নদী-নির্ঝর কত গিরিচূড়া-তরু

ঐ বাঞ্ছিত বন্ধুর তরে আসন রেখেছে পেতে

কালো মৃত্তিকা ঝরা কুসুমের বন্দনা-মালা গেঁথে

ছড়ায়ে পড়িছে দিগ্‌দিগন্তে ক্ষ্যাপা পথিকের লাগি!

বাবলা বনের মৃদুল গন্ধে বন্ধুর দেখা মাগি

লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস!

ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস

নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে ফিরে

বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে!

তারই লাগি ভায় ইন্দ্রধনুক নিবিড় মেঘের কূলে,

তারই লাগি আসে জোনাকি নামিয়া গিরিকন্দরমূলে।

ঝিনুক-নুড়ির অঞ্জলি ল'য়ে কলরব ক'রে ছুটে

নাচিয়া আসিছে অগাধ সিন্ধু তারই দুটি করপুটে।

তারই লাগি কোথা বালুপথে দেখা দেয় হীরকের কোণা,

তাহারই লাগিয়া উজানী নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে সোনা!

চকিতে পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে

ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন্ সে নিরুদ্দেশে!

যত্ন করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল,

চাহে না রতন-মণিমঞ্জুষা হীরে-মাণিকের দুল,

-তার চেয়ে ভালো অমল উষার কনক-রোদের সীঁথি,

তার চেয়ে ভালো আলো-ঝল্মল্ শীতল শিশিরবীথি,

তার চেয়ে ভালো সুদূর গিরির গোধূলি-রঙিন জটা,

তার চেয়ে ভালো বেদিয়া বালার ক্ষিপ্র হাসির ছটা!

কী ভাষা বলে সে, কী বাণী জানায়, কিসের বারতা বহে!

মনে হয় যেন তারই তরে তবু দুটি কান পেতে রহে

আকাশ-বাতাস-আলোক-আঁধার মৌন স্বপ্নভরে,

মনে হয় যেন নিখিল বিশ্ব কোল পেতে তার তরে!